ঘোষিত তপসিল অনুযায়ী আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার সময় শেষ হচ্ছে আগামীকাল সোমবার। এর আগে দল-জোটগুলোতে চলছে ভাঙাগড়ার খেলা। বিএনপি থেকে কোনো আসন কিংবা চাহিদা অনুযায়ী আসনসমূহ ছাড় না পেয়ে দলটির দীর্ঘদিনের পুরোনো মিত্রদের কেউ কেউ ভিড়ছেন জামায়াতের জোটে; কেউ ঘোষণা দিয়েছেন এককভাবে নির্বাচনের। নতুন করে জোটে সম্পৃক্ত হতে কয়েকটি দলের আগ্রহের কারণে আসন বণ্টন নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে জামায়াতেও।
সংশোধিত গণপ্রতিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী জোটের প্রার্থী হলেও নিবন্ধিত দলের নেতাদের লড়তে হবে নিজ প্রতীকে। এমন বাধ্যবাধকতার কারণে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচন করতে কেউ কেউ নিজের এতদিনের দল ছেড়েছেন। কেউ কেউ আসনের বিনিময়ে বিএনপিতে বিলীন হয়ে নিজের দলই বিলুপ্ত করেছেন। আবার কোন দলের সঙ্গে জোট বাঁধবে, এ নিয়ে পছন্দ-অপছন্দের জেরে কেউ কেউ দল থেকে পদত্যাগ করে ‘স্বতন্ত্র’ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণাও দিচ্ছেন। নির্বাচন সামনে রেখে আসন-সমঝোতায় এরকম নানামুখী সমীকরণ ঘটছে দল-জোটগুলোতে।
ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে গতকাল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন মুহাম্মদ রাশেদ খান। ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) আসন থেকে তিনি ‘ধানের শীষ’ নিয়ে নির্বাচন করবেন। আগের দিন শুক্রবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো গণঅধিকার পরিষদের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘দলের উচ্চতর পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় দল থেকে সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
রাশেদ খান বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি মো. ফারুক হাসান গতকাল তার ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আমার দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা এবং বন্ধু রাশেদ খান আজকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদান করেছেন। রাশেদের জন্য দোয়া ও শুভ কামনা। দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা মানুষকে আমি একদমই পছন্দ করি না। দুই নৌকায় পা না দিয়ে যেখানেই যেতে চান পরিষ্কারভাবেই চলে যাওয়া উচিত। এতে সংগঠন এবং দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল।’ উল্লেখ্য, রাশেদ খান ছাড়াও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে একটি আসন (পটুয়াখালী-৩) ছাড় দিয়েছে বিএনপি। তবে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নুর দলীয় প্রতীক ‘ট্রাক’ মার্কায় নির্বাচন করবেন।
জামায়াতের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিষয়টি নিয়ে দলের অনেকের সম্মতি থাকলেও একটি অংশের ভিন্নমতও রয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত এনসিপির সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা নিয়ে এনসিপিতে মতভেদের মধ্যেই গতকাল ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা। ঐ আসনে এনসিপি তাকে প্রার্থী মনোনীত করেছিল।
গত ২৪ ডিসেম্বর কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি বিএনপির সঙ্গ ছাড়ার ঘোষণা দেয়। তার সঙ্গে বিএনপির আসন সমঝোতা হয়নি। তার দলের মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ ঐদিন বিএনপিতে যোগ দেন, তিনি ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে কুমিল্লা-৭ আসনে ভোট করবেন। এ আসনে তিনি আগেও সংসদ সদস্য ছিলেন। বিএনপি সরকারে প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন তিনি।
রেদোয়ান বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পরপরই এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন অলি আহমদ। জানা গেছে, তিনি নিজের ও ছেলের জন্য চট্টগ্রামে দুটি আসন চেয়েছিলেন বিএনপির কাছে। তবে বিএনপি শুধু তার ছেলেকে একটি আসনে ছাড় দিতে চেয়েছিল। এতে রাজি হননি অলি আহমদ। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, অলি আহমদ জামায়াতের সঙ্গে জোটভুক্ত হওয়ার আলোচনা করছেন। জামায়াত থেকে তাকে তিনটি আসনে ছাড় দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
অলি আহমদ গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা- ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক সরকার, গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব, আইনের শাসন এবং জাতীয় মর্যাদা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক ঐক্য। এই প্রেক্ষাপটে এলডিপি নির্বাচন কমিশনে এক নম্বর নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশের সব জাতীয়তাবাদী ও মুক্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে একটি গণতান্ত্রিক জোটে একত্রিত হওয়ার জন্য আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছে।’
আসন সমঝোতা না হওয়ায় বিএনপির সঙ্গে ২০ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে দলটির দীর্ঘদিনের মিত্র বাংলাদেশ লেবার পার্টি। দলটি জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছে বলে আলোচনা আছে। জানা গেছে, দলটির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের সঙ্গে ইতিমধ্যে জামায়াতের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা প্রাথমিকভাবে আলোচনাও করেছেন। জামায়াতের আমন্ত্রণে শুক্রবার ছাত্রশিবিরের সম্মেলনেও গেছেন ইরান।
বিএনপির দীর্ঘদিনের যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী ছিল আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি। এই দলটির সঙ্গেও বিএনপির আসন সমঝোতা হয়নি। জেএসডি শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, তারা এককভাবে ভোট করবে। মূলত লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও রবের স্ত্রী তানিয়া রব প্রার্থী হতে চান। কিন্তু এ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে দলটির সমঝোতা হয়নি। জানা গেছে, জেএসডিকে সঙ্গে পেতে জামায়াতের পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখানো হয়েছে। তবে, জেএসডি সাড়া দেয়নি।
তানিয়া রব শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক পটভূমিতে বিএনপি সমঝোতার রাজনীতি ও ঘোষিত রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতি ‘প্রত্যাশিত সম্মান ও নিষ্ঠা’ প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, এর ফলে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়াটি আরো জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জেএসডি আসন্ন নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান তিনি।
গত বুধবার জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ইসলামী ঐক্যজোট, গণঅধিকার পরিষদসহ কয়েকটি দলকে আরো ১০টি আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঢাকা-১৩ আসনে প্রার্থী হচ্ছেন। তিনি ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। ববি হাজ্জাজের ‘এনডিএম’ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। স্ত্রীকে দলের চেয়ারম্যান বানিয়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট করতে ববি হাজ্জাজ সরাসরি বিএনপিতে যোগ দেন।
নড়াইল-২ আসনটি বিএনপি ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে ছেড়ে দিয়েছে। এনপিপি নিবন্ধিত না হওয়ায় তিনি বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। এছাড়া, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ঢাকা-১২, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে বগুড়া-২, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন ছেড়েছে বিএনপি। তবে, তাদের প্রতেক্যের দল নিবন্ধিত এবং তারা নিজ নিজ দলীয় প্রতীকেই নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে।
পিরোজপুর-১ আসনটি বিএনপি জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারকে দিয়েছিল। তবে, এখানে পরিবর্তন এনে বিএনপি গতকাল দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এছাড়া, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকেও চারটি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। আসন চারটি হলো সিলেট-৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, নীলফামারী-১ ও নারায়ণগঞ্জ-৪।
বিএনপির যুগপত্ আন্দোলনের মিত্র জোট ‘১২ দলীয় জোট’-এর মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন সেলিম গত ৮ ডিসেম্বর নিজ দল ‘বাংলাদেশ এলডিপি’ বিলুপ্ত করে সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি এলডিপির হয়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে এই আসনে নির্বাচন করেছিলেন। ১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র সৈয়দ এহসানুল হুদা নিজের পিতার গড়া দল ‘জাতীয় দল’ বিলুপ্ত করে গত ২২ ডিসেম্বর সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
দীর্ঘদিনের যুগপত্ আন্দোলনের আরেক মিত্র ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’ আরো আগেই বিএনপির সঙ্গ ছেড়েছে। দলটি এরই মধ্যে এনসিপি ও এবি পার্টির সঙ্গে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠন করেছে।